- কিশোরীকাল, নারীর অর্জন

ডলির জয়ে উচ্ছ্বসিত মৌলভীবাজার

ডলির বিজয়ে আনন্দিত সবাই। তার পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে আনন্দে উচ্ছ্বসিত এ মৌলভীবাজার জেলাবাসীসহ পুরো দেশ। কারণ, তিনিই প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যিনি কানাডার জনগণের বিপুল ভোটে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন। কানাডার প্রাদেশিক নির্বাচনে এমপিপি (মেম্বার অব প্রভিন্সিয়াল পার্লামেন্ট) নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েছেন। ৭ই জুন নির্বাচন হলেও ফলাফল ও তার বিজয়ের খবর শুক্রবার দুপুর থেকে লোক মুখে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ায়। দেশ ও প্রবাসে থাকা মৌলভীবাজারের বাসিন্দারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে উষ্ণ অভিনন্দন জানান। ফেসবুকে অনেকেই ডলি দেশের গর্ব, আমাদের অহংকার এমন অনুপ্রেরণামূলক লেখা ও তার ছবি দিয়ে স্ট্যাটাস দেন।

ডলিকে নিয়ে এমন সব লেখা ও তার ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়। এখন ফেসবুকে তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ সবাই। নির্বাচনের আগে থেকেই আত্মীয়স্বজন ও কানাডা প্রবাসী বাংলাদেশিরা ডলি বিজয়ী হবেন- এমনটাই প্রত্যাশা করেছিলেন। তার বিজয়ে আনন্দে উদ্বেলিত সবাই। কানাডা প্রবাসী বড়লেখা উপজেলার আজিমগঞ্জ সালদিঘা বড়বাড়ির বাসিন্দা কামরুল ইসলাম, মো. আশরফ তানিম ও মো. আরিফ তায়েফ গতকাল দুপুরে মানবজমিনকে বলেন, ডলির বিনয়ী স্বভাব, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দল ও কমিউনিটির প্রতি তার উদার আন্তরিকতা তাকে বিজয়ী করেছে। তার বিজয়ে সে দেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হলো। এতে প্রবাসে থাকা নতুন প্রজন্ম সে দেশের স্থানীয় রাজনীতিতে অংশ নিতে উৎসাহবোধ করবেন।

আগামীদিনে কানাডার রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের অবস্থান আরো শক্ত হবে। জানা যায় এর আগে সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে এ জেলার ৫ জন প্রবাসী বাংলাদেশি সে দেশের কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। একের পর এক দেশে এ জেলার বাসিন্দা প্রবাসীরা ওই দেশগুলোর জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ায় স্থানীয়রা আনন্দিত। এ বিষয়ে গতকাল দুপুরে মুঠোফোনে মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দা সায়রা মহসীন, মৌলভীবাজার পৌর মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ফজলুর রহমান, জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি প্রবীণ রাজনীতিবিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান মুজিব, সাবেক ব্রিটিশ কাউন্সিলর ও বিশিষ্ট শিল্পপতি এমএ রহিম সিআইপি, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বকসী মিছবাহ উর রহমান মানবজমিনকে বলেন প্রবাসে এজেলার বাসিন্দারা যেভাবে স্থানীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হচ্ছেন তাতে দেশবাসীর সঙ্গে আমরাও আনন্দিত ও গর্বিত। ডলিসহ অন্যদের এমন সাফল্যে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে। আমরা জেলাবাসীর পক্ষ থেকে তাকে অভিনন্দন জানাই।

জানা যায়, ড?লি বেগম কানাডার ওন্টারিও প্রদেশের প্রভিন্সিয়াল পার্লামেন্ট নির্বাচনে টরেন্টো এলাকার স্কারবোরো সাউথ ওয়েস্ট আসন থে?কে এমপিপি নির্বাচিত হয়েছেন। গত ৭ই জুন অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে তিনি নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টির (এনডিপি) এর মনোনয়নে নির্বাচন করেন। এর আগে কোনো বাঙালি কানাডার নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারেননি। তিনি মৌলভীবাজার জেলার সদর উপজেলার মনুমুখ ইউনিয়নের বাজরাকোনা গ্রামের সন্তান ডলি বেগম। তার দাদা মো. সোনা মিয়া। তিনি মনুমুখ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. সুজন মিয়ার নাতনী (ভাগ্নার) মেয়ে। ডলির বাবা মো. রাজা মিয়া ৩ ভাইয়ের মধ্যে মেজো। ডলির বড় চাচা মো. বাদশা মিয়া স্বপরিবারে লন্ডনে থাকেন। আর ছোট চাচা দেশে থাকেন। তার নানা বাড়ি রাজনগর উপজেলার হরিনা চংগ্রামে। ডলি বেগম রাজা মিয়া ও জবা বেগম দম্পত্তির বড় সন্তান। এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে ডলি বেগম বড়। তার ছোট ভাই মহসিন আহমদ। ১৯৯৮ সালে ডলি তার বাবা-মার সঙ্গে কানাডায় পাড়ি জমান। অবশ্য তার বাবা এর আগে কানাডায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। ডলি মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মনুমুখ উচ্চ বিদ্যালয় ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে অধ্যয়নরত থাকা অবস্থায় প্রবাস জীবনে চলে যান। সেখানে কানাডার গর্ডন এ ব্রাউন মিডল স্কুল ও ডব্লিউ এ পোর্টার কলিজিয়েট ইনস্টিটিউট কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। এরপর ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো (সেন্ট জর্জ) থেকে রাষ্ট্র বিজ্ঞানে অনার্স সম্পন্ন করেন। এরপর লন্ডনের বিশ্বখ্যাত ইউসিএল বিশ্ববিদ্যালয় হতে ডেভেলপমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড প্লানিং বিষয়ে মাস্টার্স করেন। ছাত্রজীবনে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন ডলি। তিনি স্কুল জীবন থেকে নানা বিষয়ে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। বলতে গেলে ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির প্রতি আগ্রহী ছিলেন। তাই ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতির মাধ্যমে মানুষের কল্যাণেও নিবেদিত হন এবং অতি অল্প সময়ে সবার পরিচিত মুখ হয়ে উঠেন। তিনি স্কারবোর হেলথ এলায়েন্সের কো-চেয়ারম্যান হিসেবেও কাজ করেছেন। কমিনিটির কল্যাণেও নিবেদিত ছিলেন তিনি। ডলি বেগমের নির্বাচনী প্রচারণার সময় স্লোগান ছিল ‘আমাকে নির্বাচিত করুন, আমি আপনাদের আশাহত করব না।’ ডলির এই বিজয়ে কানাডায় বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি নতুন প্রজন্মের তরুণদের প্রেরণা জোগাবে বলেই মনে করেন কানাডায় বসবাসরত বাংলাদেশিরা। ডলি প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভ পার্টির গ্রে এলিয়েসকে প্রায় ৬ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারান। ডলি পান ১৯,৭৫১ ভোট। ডলি নির্বাচনে দাঁড়ানোর পর কানাডায় বসবাসরত বাঙালিদের অকুণ্ঠ সমর্থন পান। ভোটের আগে ভোটারদের উদ্দেশ্যে ডলি বলেছিলেন, আমি আপনাদেরই একজন, আপনাদেরই মতো জীবনযুদ্ধের প্রতি পদে হাজারো বাধাবিপত্তি আর অসাম্যের হয়ে লড়াই করা একজন। তাই আমি নির্বাচিত হওয়া হবে আমাদের মতো হাজারো মানুষের নিজেদের বিজয়।’ তিনি সে দেশের তরুণ সমাজকে মাদকমুক্ত করে রাজনীতি ও জনকল্যাণে নিবেদিত হতে দীর্ঘদিন থেকে কাজ করছেন। তাছাড়া নিরবচ্ছিন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতেও তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। শুক্রবার সকাল থেকে মৌলভীবাজারসহ মনুমুখ বাজরাকোনা গ্রামে চলছে উৎসবের আমেজ। তারা ডলির এমন বিজয়ে আনন্দে উদ্বেলিত। ডলি বেগমের ছোট চাচা মুনমুখ ইউনিয়নের বাজরাকোনার বাসিন্দা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডাইরেক্টর মো. আব্দুস শহীদ মানবজমিনকে বলেন ডলি বেগম কানাডার জনপ্রনিধি নির্বাচিত হওয়ায় তার দল, দেশ ও প্রবাসীদের মতো তিনিও আনন্দিত। এই প্রথম বাংলাদেশি একজন নারীকে সে দেশের এমপিপি নির্বাচিত করার সম্মানিত ভোটারদের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, ডলি তার বাবা-মা ও ভাই প্রায়ই দেশে আসেন। দেশে আসলে তারা গ্রামের বাড়িতেই বসবাস করেন। ডলিরও জন্ম মাটি ও দেশের প্রতি যথেষ্ট টান রয়েছে। তিনি দেশ ও প্রবাসে থাকা বাংলাদেশি ও মৌলভীবাজারী নাগরিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং তার জন্য সবার কাছে দোয়া চান। ডলি বেগমের সম্পর্কীয় দাদা মুনমুখ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. সুজন মিয়া জানান পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তার বাবা রাজা মিয়া সে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় দীর্ঘদিন বিছানায় থাকার কারণে পারিবারিকভাবে অনেক কঠিন সময় অতিক্রম করতে হয়েছে ডলির। সে সময় একমাত্র ছোট ভাই মহসিন ও পরিবারের হাল ধরেছেন ডলি। তিনি বলেন, তার সততা ও উদ্দ্যমতা, দৃঢ় মনোবল ও সবার দোয়ায় তিনি এপর্যায়ে আসতে পেরেছেন। তিনি তার জন্য দেশ বাসীর কাছে দোয়া চান।

TG Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *