- নারী নির্যাতন

যাত্রাপথে নতুন আতঙ্ক ধর্ষণ

নাহিদ তন্ময় ও সাজিদা ইসলাম পারুল :: প্রায় সাড়ে ছয় বছর আগে, ২০১২ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভারতের দিল্লিতে চলন্ত বাসে নির্ভয়া (ছদ্মনাম) নামের এক ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় ক্ষোভের আগুনে জ্বলে উঠেছিল ভারত। বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বই এ ঘটনায় আন্দোলিত হয়। চলন্ত বাসেও এমন নৃশংস অপরাধ সংঘটিত হতে পারে জেনে মানুষ বিস্মিত হয়।

তখন বিশ্বাস করা কঠিন ছিল যে বাংলাদেশেও এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। বিস্ময় জাগানো ওই ঘটনার ঠিক এক মাস পর ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে মানিকগঞ্জে চলন্ত বাসে এক নারী পোশাক শ্রমিক ধর্ষণের শিকার হন। সেটাই শেষ নয়, ছিল শুরু মাত্র। এরপর নিয়মিতই চলন্ত গাড়িতে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে এ দেশে।

গত বছর বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১২ মাসে গণপরিবহনে ২১ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। বাস, প্রাইভেট কার, অটোরিকশা, নৌযানসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহনে এসব ঘটনা ঘটে।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে গণপরিবহনে যাতায়াতকালে ৯৪ শতাংশ নারী কোনো না কোনো সময় মৌখিক ও শারীরিকসহ নানাভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ না হওয়া, বাসে অতিরিক্ত ভিড়, যানবাহনে পর্যাপ্ত আলো না থাকা ও তদারকির অভাব (সিসি ক্যামেরা না থাকা) নারীদের যৌন হয়রানির মূল কারণ হিসেবে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়।

তবে সময়ের ব্যবধানে গণপরিবহন এখন আর শুধু যৌন হয়রানিতে আটকে নেই। ধর্ষণের চেষ্টা, ধর্ষণ-গণধর্ষণ এমনকি ধর্ষণের পর হত্যা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে যানবাহনে যৌন হয়রানির আতঙ্ক রুখতে বাসে জাতীয় জরুরি পরিসেবা নম্বর ৯৯৯ লিখে রাখা বাধ্যতামূলক করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথম থেকে যানবাহনে নারীদের ওপর চলা সহিংসতার অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করলে বর্তমান পরিস্থিতির উদ্ভব হতো না। নারী নেত্রীরা মনে করছেন, এসব ঘটনায় জড়িতদের তাৎক্ষণিক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টিও বিশেষ জরুরি।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক সমকালকে বলেন, যানবাহনে ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ন্যক্কারজনক। একজন নারীকে এভাবে নির্মম পাশবিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যার ঘটনা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। যানবাহনে নারীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত সময়ের মধ্যে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলে এই প্রবণতা বন্ধ করা যাবে না। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে এমন ঘটনা ঘটছে এবং বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তিনি বলেন, গণপরিবহনে এ ধরনের ঘটনার দায়িত্ব বাস মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোকে নিতে হবে। চলন্ত গাড়িতে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা রোধে পুলিশ, বিআরটিএ, বাস মালিক, শ্রমিক ও সরকারকে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। চালক, সুপারভাইজার ও হেলপারের চরিত্র সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজ-খবর নিতে হবে। বিআরটিএকেও সতর্ক থাকতে হবে। লাইসেন্স দেওয়ার আগে চালকের ‘ডোপ টেস্ট’ করাতে হবে। মাদকাসক্ত হলে লাইসেন্স দেওয়া ঠিক হবে না।

গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় আনুমানিক ২৫ বছর বয়সী এক নারী রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড থেকে টঙ্গীর উদ্দেশে আসমানী পরিবহনের (ঢাকা মেট্রো-ব-১১-৮৩২৮) একটি বাসে ওঠেন। বাসের মধ্যে ওই তরুণী ঘুমিয়ে পড়েন। সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে কারও হাতের স্পর্শে তার ঘুম ভাঙলে দেখতে পান বাসের চালক-হেলপারসহ আরও কয়েকজন তাকে ঘিরে ধরেছে। তার কাছে থাকা মোবাইল ফোন ও একটি স্বর্ণের চেন ছিনিয়ে নেয় তারা। এরপর মেয়েটিকে ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। নিরুপায় মেয়েটি চলন্ত বাসের জানালা দিয়ে বাইরে লাফিয়ে পড়েন। এতে তার মাথা, হাত-পাসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ গুরুতর জখম হয়। চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করা এ ঘটনায় একটি মামলাও হয়েছিল। পুলিশ চালককে গ্রেফতার করতে পারলেও বাকিরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।

জীবনের মায়া ত্যাগ করে চলন্ত বাস থেকে লাফিয়ে পড়ে এ তরুণী গণধর্ষণের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারলেও রাজধানীর ইবনে সিনা হাসপাতালের নার্স শাহিনুর আক্তার তানিয়া বাঁচতে পারেন নি। গত ৬ মে কর্মস্থল ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ যাওয়ার পথে চলন্ত বাসে গণধর্ষণের শিকার হন তিনি। ভয়ঙ্কর বিপদ আগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন তানিয়া। তাই গন্তব্যে পৌঁছার আগেই মালপত্র গুছিয়ে স্বর্ণলতা পরিবহনের ওই বাস থেকে নামতে চেয়েছিলেন তিনি। বাসের চালক নুরুজ্জামান নুরু ও হেলপার লালন মিয়া এবং তাদের এক সহযোগী তানিয়াকে নামতে দেয়নি। গণধর্ষণের পর বাসের দরজা দিয়ে নিচে ফেলে দুর্ঘটনার নাটক সাজায় মানুষরূপী এ তিন হায়েনা। ঘটনার পর গ্রেফতার বাসচালক ও হেলপার পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বর্ণনা করেছে তানিয়াকে গণধর্ষণের পর হত্যার লোমহর্ষক কাহিনী।

শুধু এই দু-একটি লোমহর্ষক ঘটনাই নয়, ঢাকার আশপাশে রাস্তাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে। কিছু কিছু ঘটনা জানাজানি হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীরা লোকলজ্জার ভয়ে এসব গোপন করেন।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী তাদের প্রতিবেদনের বরাতে সমকালকে বলেন, ১২ মাসের হিসাবে দেখা যায় গণপরিবহনের চালক-হেলপারসহ সহযোগীরা ৯টি গণধর্ষণ, আটটি ধর্ষণ ও চারটি শ্নীলতাহানির ঘটনায় জড়িত। এসব ঘটনায় ৫৫ জনকে গ্রেফতার করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।

তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমে যা প্রকাশ হয়, বাস্তবে গণপরিবহনে ধর্ষণের ঘটনা আরও বেশি। আগের ঘটনাগুলোর যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা হতো এবং গণপরিবহনের মালিকরা যদি শ্রমিকদের যথাযথভাবে সচেতন করতে পারতেন তাহলে এ ধরনের ঘটনা কমে আসত। তার মতে, নারীদের ওপর চলা সব ধরনের ঘটনাই সমাজের মানুষ মুখ বুজে সহ্য করে। আর এ কারণে দিন দিন ধর্ষণের মতো ঘটনা বেড়ে চলছে।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে এক তরুণীকে গণধর্ষণের পর হত্যা করে বাসচালক, সহকারীসহ পাঁচ পরিবহন শ্রমিক। টাঙ্গাইলের ঘটনাটি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন স্বপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত করে। কমিশন দ্রুত সময়ের মধ্যে আসামিদের বিচারের আওতায় আনতে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সমকালকে বলেন, ধর্ষণের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকছে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের দ্রুত শনাক্ত করে বিচারের মুখোমুখি করছেন। দ্রুততার সঙ্গে বিচার নিষ্পত্তিরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার এরই মধ্যে এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সরকারও কাজ করছে। তবে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে এ বিষয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান মন্ত্রী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইম্যান অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান তানিয়া হক সমকালকে বলেন, বর্তমানে যানবাহনে ধর্ষণের ঘটনা শঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এ পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ জরুরি। নারীদের ওপর চলা নির্যাতনের ঘটনায় তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। অপরাধীরা অপরাধ করে পার পেয়ে গেলে অন্য অপরাধীরা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। যানবাহনে ধর্ষণের মতো ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণ করতে এসব ঘটনায় জড়িতদের তাৎক্ষণিক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, নির্দিষ্ট একটি-দুটি কারণে ধর্ষণ বাড়ছে না। এর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এর অন্যতম কারণ নারীকে অধীন করার চেষ্টা। নারীরা অন্য যে কোনো নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ করলেও ধর্ষণের মতো ঘটনা গোপন রাখতে চায়। শুধু ভিকটিম নারীই নয়, পুরো পরিবারই গোপনীয়তার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়। আর এই সুযোগটিই নেয় অপরাধীরা। এ ছাড়া আইনের কাছে মানুষ সহজে পৌঁছাতে পারে না। আবার আইনের আশ্রয় নিতে গিয়ে অনেকে হয়রানির শিকার হন। তবে ভিকটিমকে হয়রানি না করে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আবুল কালাম সমকালকে বলেন, এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা পরিবহন খাত সম্পর্কে মানুষকে নেতিবাচক ধারণা দেয়। মালিককে ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত ও সমাজে হেয়প্রতিপন্ন হতে হচ্ছে কিছু উচ্ছৃঙ্খল শ্রমিকের কারণে। তিনি বলেন, চালক, হেলপার, সুপারভাইজার নিয়োগের ক্ষেত্রে তার চরিত্র এবং অতীত ইতিহাস সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য বাস মালিকদের অনুরোধ করবেন তারা। নিয়োগের আগে শ্রমিকদের বাবা-মায়ের সম্পর্কেও খোঁজ-খবর নিতে হবে। বাসে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা আর যেন না ঘটে, সে জন্য সবাইকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সমকাল

TG Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *