- নারী নির্যাতন

বিকৃত যৌন লালসা: সমাধান কী?

যৌনতা শুধু একটা বায়োলজিক্যাল বা শারীরিক বিষয় নয়, এর সাথে সামাজিক, মানসিক এবং সাংস্কৃতিক বিষয়গুলোও যুক্ত৷ শিশু ধর্ষণ বা উৎপীড়ণ কোন সমাজেরই প্রচলিত সংস্কৃতি বা নিয়মের সাথে মেলে না৷

এ কারণে সব সমাজেই পেডোফেলিয়া বা শিশুকামিতা হচ্ছে একটি বিকৃত যৌনাচার৷

যারা শিশুদের যৌন উৎপীড়ণ করে আনন্দ পায় তারা পেডোফাইল বা শিশুকামী৷ পৃথিবীতে একে ‘সবচে হিংস্র এবং জঘন্য ধরনের অপরাধ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা৷ বিশ্বের সব দেশেই কম-বেশি এধরনের অপরাধ ঘটতে দেখা যায়৷

তবে বাংলাদেশে এবছর জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬ মাসে প্রায় ৪০০ শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে, বলে জানিয়েছে বেসরকারি সংগঠন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন৷ এরমধ্যে ৮ জন ছিল ছেলেশিশু৷ ধর্ষণের পর এক ছেলে শিশুসহ মারা গেছে ১৬টি শিশু৷ এর আগে ২০১৮ সালে ৩৫৬ জন শিশু এবং ২০১৭ সালে ৫৯৩ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিল বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যায়৷ তবে এই পরিসংখ্যানগুলো যে সম্পূর্ণ তা হয়তো বলা যাবে না, কারণ, সত্যি বলতে, শিশু নির্যাতনের কয়টা খবরইবা আমরা জানি? কয়টাই বা সংবাদ মাধ্যমে আসে? খুব মারাত্মক কিছু না ঘটলে বেশিরভাগ সময় পরিবারের সদস্যরাই বিষয়টি চেপে যায়৷ ফলে যে পরিসংখ্যান আমরা পাই তা হয়তো মোট ঘটনার একটি অংশ মাত্র৷

বহুদিন ধরেই শিশুদের ওপর প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এর ব্যাপকতা বাড়ছে৷ পত্র পত্রিকা বা টিভি খুললে এমন দিন কমই পাওয়া যায় যেদিন শিশু নির্যাতনের খবর পাওয়া যায় না৷ কিন্তু কেন আশংকাজনক হারে বাড়ছে শিশু ধর্ষণ? এর পেছনে কি কারণ থাকতে পারে? সমস্যা সমাধানের জন্য এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি৷

সাধারণভাবে কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো ব্যাপক সামাজিক অবক্ষয়, নীতি-নৈতিকতার মানদণ্ডগুলির সর্বব্যাপী বিলুপ্তি ও মূল্যবোধের অধঃপতন৷ কেউ কেউ এসব ঘটনার পেছনে ইন্টারনেট পর্নোগ্রাফি সহজলভ্য হয়ে যাওয়া এবং মাদকাসক্তিকেও দায়ী করেছেন৷ আবার কারো মতে বিকৃত যৌন চাহিদা মেটানোর জন্য অপরাধীরা সব থেকে সহজ টার্গেট হিসেবে বেছে নেয় শিশুদের, কারণ তারা অরক্ষিত, অনেক সময় তাদের উপর কি ঘটছে, সেটাই তারা বুঝতে পারে না৷ তাছাড়া শিশুদের উপর ক্ষমতা প্রদর্শন সহজ, তারা শারীরিকভাবে দুর্বল৷ আর যৌন লালসা মেটানোর পরে ভয় দেখিয়ে তাদের মুখ বন্ধ করে রাখাও সহজ৷ বেশির ভাগ সময় শিশুদের ভুলিয়ে ভালিয়ে বা জোর করে পেডোফাইলরা তাদের কার্যসিদ্ধি করে৷ পথবাসী, শ্রমজীবী, দরিদ্র শিশুরা যেমন এর শিকার হয়, তেমনি মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজেও এরকম ঘটনা কম ঘটে না৷

অনেকে এসব অপরাধ বেড়ে যাওয়ার পেছনে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকেও দায়ী করেন৷ দীর্ঘদিন ধরে মামলাগুলো ঝুলে থাকা অর্থাৎ বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা, অপরাধ করেও অপরাধীর কঠোর শাস্তি না হওয়া, আইনের দুর্বলতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাফিলতি বা ব্যর্থতা এরকম ঘটনা ঘটাতে অপরাধিদের উৎসাহিত করে৷

সমাধান কী?

এক কথায়, খুব সহজে, একক উপায়ে সমাধানের কোন রাস্তা নেই৷ কিছু স্বল্প মেয়াদি, কিছু দীর্ঘমেয়াদি, কিছু পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ নিলে অবস্থার হয়তো খানিকটা পরিবর্তন হতে পারে৷

প্রথম কথা, এই ধরনের অপরাধের জন্য আইনের মাধ্যমে অপরাধীর কঠোর সাজা নিশ্চিত করার কোন বিকল্প নেই৷ এসব অপরাধের মামলাগুলোর বিচার খুব দ্রুত শেষ করা দরকার, আর সাজাটাও হওয়া উচিত দৃষ্টান্তমূলক৷ শিশু ধর্ষণের ব্যাপারে যদি আলাদা সেল করা হয়, মামলার গতি প্রকৃতি বিশেষভাবে তদারক করা হয়, তাহলে এ ধরনের অপরাধ অনেকটা কমতে পারে৷

দ্বিতীয়ত, অভিভাবকদের সচেতনতা৷ শিশু কোথায় যাচ্ছে, কোথায় খেলছে, তার চারপাশে কারা আছে সেটাও জানতে হবে৷ পরিবারে শিশুরা যেন মন খুলে কথা বলতে পারে সেরকম বন্ধুত্বপূর্ণ সহজ পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে৷ বাবা মার বিশেষ লক্ষ্য রাখতে হবে আত্মীয় প্রতিবেশির মধ্যে যৌন অপরাধি ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছে কিনা৷ কেননা শিশুকে আদর করার ছলে তারাই হয়তো শিশুকে নিপীড়ণ করে যাচ্ছে৷

স্কুল ও পরিবার থেকে শিশুকে নিজের সুরক্ষার শিক্ষা দেয়া সম্ভব। কোনটা ভাল স্পর্শ, কোনটা খারাপ স্পর্শ সেটাও শিশুকে বোঝাতে হবে৷ পশ্চিমা অনেক দেশেই শিশুদের এ বিষয়ে স্কুলে শেখানো হয়৷ কিন্তু আমাদের দেশের সামাজিক পরিস্থিতিতে শিশুদের সাথে এসব বিষয়ে খোলামেলা কথা-বার্তার প্রচলন নেই৷ শিশুর নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে স্কুল পাঠের প্রাথমিক স্তর থেকেই এ বিষয়ে শিক্ষা দেয়া যেতে পারে৷

পারিবারিক সুশিক্ষা খুবই প্রয়োজন৷ মেয়ে শিশুর পাশাপাশি ছেলে শিশুদেরও ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি বিরোধী মূল্যবোধ শেখাতে হবে৷ যাতে বেড়ে ওঠার সময় থেকেই তাদের মধ্যে এ ধরনের সচেতনতা তৈরি হয়৷ কেননা, মানুষ আজীবন তার পারিবারিক শিক্ষাকেই বয়ে বেড়ায়৷

সাম্প্রদায়িক, কূপমণ্ডুক, এক পেশে চিন্তা ভাবনা ও শিক্ষার বদলে উদারনৈতিক, ইতিবাচক মানবিক শিক্ষা ও চেতনার বিকাশ ঘটাতে হবে৷

সর্বস্তরে দরকার মুক্ত চিন্তার চর্চা, এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী ভোগের বস্তু৷ নারীর স্বাতন্ত্র্য, তার মেধা, বুদ্ধিমত্তা ও ব্যক্তিত্বকে সমাজ স্বীকার করতে চায় না৷ নারীকে অসম্মান করার যে প্রবণতা তা থেকে বেরিয়ে নারী-পুরুষ সম-মর্যাদার সুষম সমাজ বিনির্মাণ করতে হবে৷ মানুষকে মানুষের মর্যাদা দেওয়া, সম্মান করা, বিনীত থাকা, আত্মকেন্দ্রীকতা থেকে বেরিয়ে এসে একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর যে রীতি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনাচরণে তার প্রতিফলন থাকতে হবে৷

এই বদ্ধ পচা বিকারগ্রস্ত সমাজের গায়ে ফুটে ওঠা বিষ ফোঁড়া ফেটে গেছে, গলগল করে বেরিয়ে আসছে দুষিত পুঁজ, তারই লক্ষণ এসব বিকৃত যৌন লালসা, এইসব বিকারগ্রস্ত যৌন আচরণ৷ জীবন আচরণে সুস্থ, স্বাভাবিক যৌনতার চর্চা না থাকলে সেখানে বিকৃতিই জন্ম নেবে৷ শিশু ও নারীদের যখন যৌন বস্তু বিবেচনা করা হয়, তখন সমাজের সদস্যদের মধ্যে অকারণ বিকৃত যৌন কৌতুহল জাগবেই৷

আর নষ্ট করার সময় নেই৷ অভিভাবক, শিশু সংগঠন, মানবাধিকার সংস্থা, স্কুল কলেজ, এবং পাড়ার তরুণ-যুবক সবাইকে সম্মিলিতভাবে এই অপরাধ ঠেকাতে এগিয়ে আসতে হবে৷

রাষ্ট্র্র ও সরকারের ভূমিকাও এক্ষেত্রে কম নয়৷ রাজনৈতিক সদিচ্ছার কথাও আমরা সব ক্ষেত্রে বলি৷ রাজনৈতিক মদতে যেন কোনো অপরাধ না হয়, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় যেন অপরাধি লুকাতে না পারে সেরকম সুশাসনের প্রবর্তন করতে হবে৷ মূল থেকে বদলাতে হবে সমাজকে, বাইরে উন্নয়নের ঘনঘটা আর ভেতরে মুখ থুবড়ে কাঁদবে মনুষত্ব্য, মানবিকতা, এমনটা চাই না৷ পরিবর্তন দরকার, আর সেটা এখনই৷- ডি ডব্লিউ

TG Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *