- সচেতনতা

মায়ের বুকের দুধ নবজাতকের প্রথম খাবার

নবজাতকের জন্য নিরাপদ খাবার তার মায়ের বুকের দুধ। সন্তান জন্মের পর একজন মা-ই পারেন সন্তানকে শাল দুধ পান করিয়ে নিরাপদ ও রোগমুক্ত রাখতে। লিখেছেন- কামরুন নাহার

মেয়েশিশু জন্মের পর মিলি (আসল নাম নয়) নবজাতককে বুকের দুধ পান করাননি। গুঁড়া দুধ খাওয়াতেন। প্রায়ই তার সন্তান অসুস্থ থাকে। গুঁড়া দুধ খাওয়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই জোরে জোরে কান্না করে। কাঁদতে কাঁদতে হাত-পা শক্ত হয়ে যায়। কিছুদিন এ অবস্থা দেখে মিলি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়।

এ প্রসঙ্গে মিলি বলেন, নবজাতকের জন্য শাল দুধ কতটা উপকারী এ সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল না। মায়ের বুকের দুধ ছাড়া নবজাতকের পরিপাকতন্ত্র গুঁড়া অথবা গরুর দুধ গ্রহণ করতে পারে না। গুঁড়া অথবা গরুর দুধের মাধ্যমে শিশুর পেটে জীবাণু সংক্রমণও ঘটে।

সন্তান জন্মের ছয় মাস পর্যন্ত শিশুকে মায়ের বুকের দুধ ছাড়া অন্য কোনো খাবার খাওয়ানো যাবে না এটাও জানতাম না। নিজের অজ্ঞতার জন্য আমার সন্তান কষ্ট পেয়েছে। এখন আমি আমার মেয়েকে বুকের দুধ পান করাই। এখন ও সুস্থ আছে।

শিশুর শ্রেষ্ঠ খাবার মায়ের বুকের দুধ। এতে রয়েছে শিশুর বেঁচে থাকা ও বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি। রয়েছে কিছু এন্টিবায়োটিক উপাদান, যা শিশুকে বিভিন্ন সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। শিশুর বুদ্ধিমত্তা বাড়াতে সাহায্য করে।

বারডেম জেনারেল হাসপাতালের গাইনি ও অবস বিভাগের অধ্যাপক ডা. সামসাদ জাহান শেলী বলেন, নবজাতকের জন্য মায়ের বুকের দুধ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মায়ের বুকের দুধে পুষ্টি, প্রোটিন, শর্করা ও এনট্রি বডি ইত্যাদি উপাদান রয়েছে।

এ কারণে মায়ের বুকের দুধ নবজাতকের জন্য খুবই উপকারী। মায়ের বুকের দুধ ছাড়া শিশুকে অন্য কোনো খাবার খাওয়ানো যাবে না। মায়ের বুকের দুধে যে পরিমাণ এনট্রি বডি থাকে তা নবজাতকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

গরুর দুধ অথবা গুঁড়া দুধের চেয়ে শাল দুধে প্রোটিন ও ফ্যাটের পরিমাণ বেশি থাকায় তা শিশুর জন্যও উপকারী। এছাড়া নবজাতকের খাদ্যনালী অপরিপক্ক ও ছোট হয়। মায়ের বুকের দুধ ঘন এবং অল্প পরিমাণে বের হওয়ায় শিশু কম দুধ পান করে। যা তার খাদ্যনালীর সমস্যা সৃষ্টি করে না। বরং শিশুর পুষ্টির পরিমাণ ঠিক থাকে। নিয়মিত পায়খানা হতে সহায়তা করে।

শিশুকে মায়ের বুকের দুধ পান করালে মায়েরও উপকার হয়। মায়ের ওজন বাড়ার আশঙ্কা কমে, ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে এবং মায়ের প্রসব পরবর্তী জটিলতা কমে।

দীর্ঘসময় ধরে শিশুকে বুকের দুধ পান করালে মায়ের স্তন ক্যান্সার হওয়া ঝুঁকি ৬ শতাংশ কমে যায়। এছাড়া মায়ের পরবর্তী গর্ভধারণের আশঙ্কা কমিয়ে তার শরীরের ঋতুস্রাব চক্রকে ঠিক রাখতে সাহায্য করে। আরেকটি অন্যতম দিক হল মায়ের দুধ পান করালে শিশুর সঙ্গে মায়ের মানসিক সম্পর্ক দৃঢ় হয়। যা অন্য কোনোভাবে তৈরি হওয়া সম্ভব নয়।

সম্প্রতি ইউনিসেফের বিশ্লেষণে জানা যায়, বিশ্বের যে কোনো এলাকার তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ার শিশুদের বুকের দুধ খাওয়ানোর হার তুলনামূলকভাবে বেশি।

তা সত্ত্বেও শিশুর জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে তাকে বুকের দুধ পান করানো এবং ছয় মাস পর্যন্ত শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ানোর বিষয়টি আরও বেশি করে মায়েদের কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন।

কারণ আমাদের দেশে নবজাতকদের মাত্র ৫১ শতাংশ শিশুকে জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে বুকের দুধ পান করানো হয়, যা শতভাগ হওয়া দরকার।

ফলে শিশুর মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায় ২৫ গুণ। এখনও মায়ের দুধ থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে পৃথিবীতে প্রতিদিন তিন থেকে চার হাজার শিশু ডায়রিয়া ও নিমোনিয়ায় মারা যাচ্ছে। অসুস্থতা আর অপুষ্টির শিকার হচ্ছে আরও হাজার হাজার শিশু।

আমাদের দেশে ‘ক্যাম্পেইন ফর প্রমোশন অ্যান্ড প্রোটেকশন অব ব্রেস্ট ফিডিং’ নামের একটি সংগঠন ১৯৮৯ সাল থেকে মায়ের দুধ সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও সহায়তার জন্য কাজ করেছে।

এ সংগঠনটিই পরে ১৯৯৫ সালে ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশনে রূপ নেয় এবং সর্বস্তরে মায়ের দুধ খাওয়ানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে কাজ করছে।

TG Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *