- নারী নির্যাতন

‘১২ বছর পর যেদিন আমার ধর্ষককে আমি নিজ হাতে জেলে ঢোকালাম’

টাবাটা আর ফ্যাব্রিসিওর মধ্যে আবার দেখা হয় ১২ বছর পর, ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে।

টাবাটার বয়স যখন নয় বছর, তখন তার পরিচয় হয় ফ্যাব্রিসিওর সাথে । ফ্যাব্রিসিওর বয়স তখন ৩৯ বছর। সে তখন বিবাহিত এবং টাবাটার পারিবারিক বন্ধু। আর এই আস্থাভাজন বন্ধুই টাবাটাকে দুই বছর ধরে ধর্ষণ করেছে।

কিন্তু এখন ফ্যাব্রিসিওর হাতে হাতকড়া আর টাবাটা এটা তাকে নিজের হাতে পরিয়েছে। টাবাটার অন্য হাতে ধরা ছিল পিস্তল যেটি সে তাক করে রেখেছিল ফ্যাব্রিসিওর দিকে। টাবাটা তাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গেল কারাগারে এবং সশব্দে বন্ধ করে দিল তার দরোজা।

আর এরই সাথে টাবাটার মন ভরে গেল প্রশান্তিতে। মনে হলো তার জীবনের কোন এক অধ্যায়ের অবসান ঘটলো।

ফ্যাব্রিসিও ছিল একজন দক্ষ ফটোগ্রাফার যে মূলত প্রকৃতির ছবি তুলতো। একজন ভাল বক্তা। খুব সহজেই মানুষের মন জয় করতে পারতো। ভ্রমণের গল্প, সমুদ্র সৈকতের গল্প, দূরদূরান্তের দেশের গল্প বলে সবাইকে মাতিয়ে রাখতে পারতো।

পরিচয় হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই ফ্যাব্রিসিও টাবাটার বাবার সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। বিকেল বেলা তারা দু’জনে একসাথে ফুটবল খেলতো। পরের দিকে দুই পরিবার একসাথে মিলে ছুটিতে বেড়াতে কিংবা ব্রাজিলের বিভিন্ন পাহাড়ে ক্যাম্পিং করতে যেত। দক্ষিণ ব্রাজিলের এক শহরে এই দুই পরিবারের বাস।

“তখন থেকেই সে আমাকে ধর্ষণ করতে শুরু করে,” বলছেন টাবাটা।

“সে আমার ঘনিষ্ঠ হয়ে বসতো। আমার দেহের বিভিন্ন জায়গায় হাত দিতো। আমি এতই ছোট ছিলাম যে বুঝতে পারতাম না ঠিক কী ঘটছে। তবে আমি ব্যাপারটা পছন্দ করতাম না। এবং এটা যে একটা অপরাধ সে সম্পর্কেও আমার কোন ধারনা ছিল না।”

অরণ্যের গাছের আড়ালে, কিংবা সবার নজরের বাইরে নদীতে গোসল করার সময়, সে তাকে ধর্ষণ করতো বলে জানান টাবাটা।

“একদিন ক্যাম্পিং করতে গিয়ে আমাকে পানি ভরে আনতে বলা হলো,” বলছিলেন টাবাটা।

“সবার নজরের বাইরে গিয়ে আমার গায়ে হাত দিতেই আমি সেখান থেকে কোনমতে পালিয়ে গেলাম এবং দৌড়ে ক্যাম্পের দিকে ফিরে গেলাম।”

“কিন্তু আমার বাবা-মায়ের মনে কোন প্রশ্নই তৈরি হয়নি যে কেন আমি এত তাড়াতাড়ি ক্যাম্পে ফিরে এলাম। তারা কল্পনাও করতে পারেনি যে আমি এত ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হচ্ছি। কারণ তারা তাকে খুবই বিশ্বাস করতো।”

টাবাটা বলছেন, তিনি বহুবার ভেবেছেন বাবা-মাকে তিনি ঘটনাটা জানাবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারেননি।

“আমার বাবা ছিল খুবই রগচটা মানুষ। আমার ভয় ছিল তাকে বললে সে ফ্যাব্রিসিওকে মেরেই ফেলবে। আমি ভয় পেতাম ফ্যাব্রিসিওকে খুন করলে আমার বাবাকে জেলে যেতে হবে। শিশুদের মাথায় বহু ধরনের আজগুবি ভাবনা খেলে। তাছাড়া আমি মনে করতাম মা-বাবা আমার কথা বিশ্বাস নাও করতে পারে,” বলছিলেন তিনি।

সময়ের সাথে সাথে ফ্যাব্রিসিও টাবাটার পরিবারের কাজকর্মের ধারা সম্পর্কে জানতে পারে। তাবতর এক বড় বোন ছিল যে শিক্ষক হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল। তার মা রাতে কাজ করতো। তার বাবা বিকেলবেলা ফুটবল খেলতে যেত।

তারা যখন বাড়িতে থাকতো না ঠিক সেই সময়েই ফ্যাব্রিসিও বাড়িতে এসে হাজির হতো।

“সে আমাকে বলতো: ‘একটু, একটু, আরেকটু’। সে আমাকে কখনও মারতো না। কিন্তু জাপটে ধরে রাখতো। এবং তার কথা শুনতে বাধ্য করতো,” টাবাটা বলছিলেন।

তার বয়স যখন ১১, টাবাটা তখন সবলভাবে বাধা দিতে শুরু করেন। চিৎকার করে, গালাগালি করে তিনি ফ্যাব্রিসিওকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করতেন।

টাবাটা ভেবেছিলেন যে তার মা’কে কথাটা জানাবে। কিন্তু সে সময় মা অসুস্থ হয়ে পড়ার পর টাবাটা সেই চিন্তা ত্যাগ করেন।

আরও একটা ঘটনা ঘটে ঠিক একই সময়। ফ্যাব্রিসিওর স্ত্রীর সাথে টাবাটার বাবার অবৈধ সম্পর্কের কথা ফাঁস হয়ে যায়। ফলে ফ্যাব্রিসিও যখন ঐ বাড়িতে আসা-যাওয়া বন্ধ করে দেয় তখন টাবাটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে।

এর পরের কয়েক বছর অনেক চেষ্টা করেও টাবাটা কোনভাবেই মন থেকে তার ধর্ষণের স্মৃতি মুছে ফেলতে পারেননি।

টাবাটার বয়স যখন ১৬, তখন তার মা তার বন্ধুদের কাছ থেকে প্রথম এই নির্যাতনের কথা জানতে পারেন। ততদিনে বাবা-মা’ও জেনে গেছেন যে ফ্যাব্রিসিও একজন দাগী শিশু নির্যাতনকারী।

“আমার মা যখন আমাকে জানালেন যে সে আমার মতো আরো মেয়েদের ওপর যৌন হামলা চালিয়েছে, সেটা শুনে আমার খুবই রাগ হয়েছিল।”

তার প্রথম ধর্ষণের ঘটনার সাত বছর পর, টাবাটা নিজেই পুলিশের কাছে গিয়েছিলেন অভিযোগ জানাতে। কিন্তু পুলিশ তার অভিযোগ গ্রহণ করেনি।

তারও ছয় বছর পর টাবাটা যখন আইন শিক্ষায় ডিগ্রি লাভ করেন এবং পুলিশ বিভাগে চাকরির জন্য প্রশিক্ষণ শুরু করেন, তখনও তার অভিযোগনামা পড়ে ছিল সরকারি কৌসুলির অফিসে।

“আমি নিজে গিয়ে যখন জিজ্ঞেস করলাম কেন তারা আমার অভিযোগের তদন্ত করছে না, তখন ঐ কৌঁসুলি আমার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করে। আমাকে সে বলে যে ঘটনাটা অনেকদিন আগে ঘটেছে। কোন সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই। এবং আমি অনেক দেরি করে ফেলেছি।”

ফ্যাব্রিসিওকে জেলের ভাত খাওয়ানোর আশা যখন শেষ হয়ে যাচ্ছিল, তখনই টাবাটার বাবার মাথায় একটা বুদ্ধি আসে। তিনি টাবাটাকে বলেন ফ্যাব্রিসিওর নির্যাতনের শিকার অন্য মেয়েদের খুঁজে বের করতে এবং তাদের সাথে কথা বলতে।

এর পরেই আইনের জট খুলতে শুরু করে এবং মামলা শুরু হয়।

বিচারের শুনানির সময় ফ্যাব্রিসিও দাবি করে যে বাবার সাথে তার বিবাদ ছিল বলেই তাকে হেয় করতে টাবাটা এই যৌন নির্যাতনের গল্প বানিয়েছে।

মামলায় ফ্যাব্রিসিওর হার হয়। আদালত তাকে সাড়ে সাত বছরের কারাদণ্ড দেয়। কিন্তু সে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে এবং জামিন নেয়।

ইতোমধ্যে টাবাটা ২৪ বছরে পা দেন, এবং পুলিশ অ্যাকাডেমিতে তার ট্রেনিং শেষ করেন।

তার বিরুদ্ধে অন্যায়ের সুবিচার আসে ২০১৬ সালে ডিসেম্বর মাসে যখন উচ্চতর আদালতে ফ্যাব্রিসিওর আপিল খারিজ হয়ে যায়।

তাকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশ বিভাগ তাকে এবং তার এক সহকর্মীকে দায়িত্ব দেয়। তারা খবর পান যে দক্ষিণ ব্রাজিলের একটি খামার বাড়িতে ফ্যাব্রিসিও লুকিয়ে আছে।

“আমার সহকর্মী তাকে সেখান থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসে। কিন্তু তাকে কারাগারে ঢোকানোর কাজটা আমি নিজের হাত করতে চেয়েছিলাম,” বলছিলেন টাবাটা।

তিনি বলেন, যৌন সহিংসতার ঘটনা পুলিশকে জানানোর মধ্য দিয়ে এবং ফ্যাব্রিসিওকে জেলে পোরার মধ্য দিয়ে তার মনের ক্ষত ধীরে ধীরে শুকাতে শুরু করেছে।

এই ধরনের ঘটনা যখন ঘটে, তখন একজন মানুষ তার নিজের দেহকে ঘৃণা করতে শুরু করে এবং সেক্সকে খারাপ কাজ বলে ভাবতে শুরু করে, বলছিলেন তিনি।

মানুষের ওপর আবার বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে এবং অন্য কোন মানুষের সাথে নতুন করে সম্পর্ক তৈরি করতে তাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে বলে টাবাটা জানান।

“আমি সব বাবা-মাকে বলবো আপনারা আপনাদের সন্তানদের সাথে আরও বেশি করে কথাবার্তা বলুন। কোন বয়স্ক মানুষ যদি আপনার সন্তানের সাথে অসদাচরণ করে তারা যেন তৎক্ষণাৎ ঘটনাটা বাবা-মাকে জানায়, বলছিলেন তিনি, “আর মা-বাবা যেন অবশ্যই সন্তানকে আশ্বস্ত করেন এই বলে যে তারা সবসময় তার কথা বিশ্বাস করবেন।”

“আমি সব সময় বলি, যৌন নির্যাতনের শিকারকে কোন ভাবেই দায়ী করা চলে না। কারণ তাদের আচরণ বা তাদের পোশাকের জন্য তারা নির্যাতনের শিকার হন না। তারা শিকার হন কারণ তাদের ওপর যে হামলা চালায় সে মানসিকভাবে অসুস্থ।”

(ব্যক্তিগত গোপনীয়তার স্বার্থে টাবাটা এবং ফ্যাব্রিসিওর আসল নামটি এখানে ব্যবহার করা হয়নি। ব্রাজিলের যে শহরে এই যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে সেই শহরের নামটিও বদলে ফেলা হয়েছে।) বিবিসি বাংলা

TG Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *