- Awareness, Women Achievement

একটি উজ্জ্বল সাফল্য

জেসমিন চৌধুরী :: আমার ছোটভাইয়ের ছোট মেয়েটা জিপিএ ফাইভ পেয়ে এইচএসসি পাশ করেছে, কিন্তু আজ আমি ভীষণ আনন্দিত আরো একজন মানুষের সাফল্যের কারণে, যাকে আমি কখনো চোখে দেখিনি। ফেসবুকেই পরিচয়।

মেয়েটা আমার বিভিন্ন লেখায় ঝরঝরে বাংলায় মন্তব্য লিখত। যখন সে বলল সে শুধুমাত্র এসএসসি পাশ, আমি অবাক হয়ে গেলাম। এতো অল্পশিক্ষিত একটা মেয়ের এমন ভাষাজ্ঞান? পরে ইনবক্সে তার জীবনকাহিনী জেনে বুঝতে পারলাম সে আসলে অনেক মেধাবী একটা মেয়ে, মাবাবার জেদ এবং দূরদর্শীতার অভাব তাকে লক্ষ্যচ্যুত করে দিয়েছে।

মেয়েটার বিয়ে হয়েছিল খুব অল্পবয়সে। ক্লাস ফাইভে এবং এইটে বৃত্তি পাওয়া, এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ পাওয়া একটা মেয়েকে শুধুমাত্র একটা রিলেশনশিপ থাকার অপরাধে বিয়ে দিয়ে দেয়া সম্ভবত আমাদের দেশের মাবাবাদের দ্বারাই সম্ভব।

মেয়েটা তার অসুখী দাম্পত্য জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে চায়, শিক্ষিত হতে চায়, নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়। নির্যাতক স্বামীর কাছ থেকে সাহায্য পাওয়া তো দূরের কথা, নিজের আত্মীয়স্বজনরাও তার পাশে দাঁড়ায় না। ফেসবুকে পরিচিত জেসমিন চৌধুরীর সাথে সে যোগাযোগ করে মোরাল সাপোর্টের জন্য। তার গল্পটা শোনা ছাড়া আমারও করার কিছুই থাকে না। তার পুরো গল্পটা শুনে আমি অসহায় বোধ করি, পথ দেখাতে পারি না। সবসময় মনে পড়ে তার কথা কিন্তু যোগাযোগ করি না। কী বলব জানি না বলে।

আমি নিজের যুদ্ধের কথা, সাফল্যের কথা লিখে যাই। ভাবি হয়তো এগুলো পড়ে ঐ মেয়েটার মত আরো অনেকে অন্তত সাহসে বুক বাঁধতে পারবে। এর বেশি আর কী করার আছে আমার?

একটু আগে ইনবক্সে মেয়েটা জানিয়েছে সে পাশ করেছে। এসএসসির মত উজ্জ্বল ফলাফল হয়ত করতে পারেনি কিন্তু আমার দৃষ্টিতে তার আজকের সাফল্য আগের যে কোনো সাফল্যের চেয়ে অনেক বেশি গৌরবময়। এর জন্য তাকে অনেক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছে।

আজকাল ছেলেমেয়েদের ভালো ফলাফলের জন্য মাবাবারাও প্রাণান্তকর খাটাখাটনি করেন। প্রাইভেট পড়ার ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় বই কিনে দেয়া, স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখা- যত্নের শেষ নেই। এই মেয়েটাও আমার চোখে একটা বাচ্চাই, অথচ পরীক্ষা দিতে গিয়ে আদরযত্ন দূরের কথা, সে গঞ্জনা ছাড়া কিছুই পায়নি। মাত্র চব্বিশ বছর বয়স অথচ জীবন তার কাছ থেকে অনেক কিছুই কেড়ে নিয়েছে। বিনিময়ে অবশেষে সেও কেড়ে নিতে পেরেছে আজকের এই সাফল্যটুকু।

কোনো সাফল্যই সহজে আসে না, কিন্তু যারা বিরূপ পরিস্থিতিতে অনেক লড়ে একটুখানি সাফল্য ছিনিয়ে আনতে পারে, তারা আমার আত্মার আত্মীয়, তারা আমারই অন্য সংস্করণ। তাদের জন্য যে মমতা আমি বোধ করি তার কোনো নাম নেই, সীমাও নেই।

মেয়েটিকে বলব- সঙ্গত কারণে তোমার নাম উল্লেখ করতে পারলাম না কিন্তু তুমি জানো তুমি কে। তোমার মা-বাবার মত আমিও খানিকটা অপরাধী কারণ তোমার জন্য কিছুই করতে পারিনি। কিন্তু সাত হাজার মাইল দূরে বসে এই মূহুর্তে আমি তোমার জন্য হাসছি, তোমার জন্য কাঁদছি ঠিক যেমনটা হাসিকান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলাম নিজের এইচএসসির ফলাফল প্রকাশের পর। তোমাকে ভালোবাসি মেয়ে! তুমি এগিয়ে যাও। পারলে আমাদের ক্ষমা করো, না করতে পারলেও অসুবিধা নেই। তবে বারবার তোমার সাফল্যের খবর দিয়ে যন্ত্রণায় জর্জরিত করে তোলো আমাদের মত অপরাধীদেরকে যারা তোমার জন্য কিছুই করতে পারেনি।

TG Facebook Comments

3 thoughts on “একটি উজ্জ্বল সাফল্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *