- Awareness

ওয়ান মিনিট মাদার : বাচ্চাদের সাথে সঠিক আচরন পদ্ধতি

মুলঃ স্পেনসার জনসন
বাংলায়ঃ মোহাম্মদ আব্দুল লতিফ
একদা এক ইফেকটিভ মায়ের খোঁজে বের হলেন একজন ব্রাইট ইয়াং মহিলা। তিনি জানতে চান ভাল মা বাবা হওয়ার প্রকৃত সিক্রেট। তিনি জানতেন যে এটা শুধু জানা যাবে তাদের কাছ থেকে যারা গুড প্যারেন্টিং প্রাকটিস করছেন।প্রেগন্যান্ট ইয়াং ওম্যান তার স্বামীর সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বললেন। তারা এটা জানতেন যে উভয়ের কেউই জানেন না কিভাবে বাচ্চাকাচ্চা মানুষ করতে হয়। যদিও অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তারা মা বাবা হতে যাচ্ছেন। তাই তারা এ বিষয়ে নিজেদেরকে শিক্ষিত করে নিতে চাইলেন।
ইয়াং ওম্যান জব থেকে ছুটি নিলেন। তিনি তার বেবীর আগমনের অপেক্ষায় থাকাকালীন সময়ে অন্য মাদের কাছ থেকে জানতে চাইবেন কিভাবে ওরা শিশুদের বড় করে তুলছেন।
পরবর্তী কয়েক মাস তিনি কথা বললেন অনেক মহিলার সাথে। কমবয়সী ও বেশী বয়েসী, ট্রাডিশনাল হাউসওয়াইফ ও কর্মজীবি মহিলা, বেশী বাচ্চাকাচ্চার মা ও সিঙ্গেল বাচ্চার মা, বিবাহিতা ও সিঙ্গেল প্যারেন্ট, টডলার ও টিনএজারদের মা, সিরিয়াস ও ঢিলেঢালা মা, সবার সাথেই কথা বলে চললেন।
ইয়াং ওম্যান জানতে থাকলেন বাচ্চাকাচ্চা মানুষ করার বিভিন্ন পদ্ধতির কথা।
তিনি বুঝতে পারলেন-যারা কথা বলছেন তারা কত যত্নশীল। কত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন ভাল মা হওয়ার জন্য। তিনি প্রায়ই দেখতে পেলেন এদের মধ্যে অনেকেই দুর্বল প্যারেন্টিং এর ফলাফল নিয়ে ভাবেন না। ওদের বাচ্চাদের চোখে রয়েছে স্পর্ধা ও উদাসীনতা; মাবাবার রয়েছে দুঃখ ও হতাশা। যা দেখলেন তা খুব একটা ভাল লাগলো না তার কাছে।
কিন্তু তিনি জানতেন আরো ভাল উপায় আছে। তিনি জানতেন গুড প্যারেন্টিং নিয়ে আসবে ঘরে ঘরে ভালবাসা, শান্তি ও আনন্দ-শিশুদের ও মাবাবার।
তিনি সেই পদ্ধতি খুঁজে নিতে প্রতিজ্ঞা করলেন।
তিনি অনেক মহিলাদের কথা জানলেন-যাদেরকে টাফ প্যারেন্ট বলা হয়-যারা বাচ্চাদের কঠোরভাবে শাসন করেন।
তাদের এই দৃঢ়তা ও সামঞ্জস্যতা দেখে তাদের বন্ধুরা ভাবতেন ওরা খুব ভাল মা।
কিন্তু শিশুরা অনেকে সেটাকে ভিন্নভাবে দেখছিলো। এসব টাফ প্যারেন্টদের বাসায় বসে মহিলা জিজ্ঞেস করতেন-আপনারা নিজেদেরকে কি ধরনের প্যারেন্ট বলে মনে করেন?
তাদের উত্তর ছিল প্রায় একই।
-আমি একজন কনজারভেটিভ প্যারেন্ট মনে করি-ভিজিটরকে বলা হতো আমি-পুরাতনপন্থী ও ট্রাডিশনাল। তিনি ওদের কণ্ঠস্বরে পেতেন গর্ববোধ এবং শিশুদের ভাল আচরণের প্রতি আগ্রহ।
তিনি অনেক নাইস মায়ের সঙ্গে কথা বললেন। মনে হলো ওরা সবকিছুর উপরে তাদের বাচ্চাদেরকে স্থান দিয়ে থাকেন।
অনেকে তাদের বোধশক্তি ও সহানুভবতা দেখে মনে করতেন তারা ভাল মা।
কিন্তু তাদের শিশুরা তা অন্যভাবে দেখতো। ইয়াং ওম্যান ওদের সাথে বসে একই প্রশ্নের ব্যাপারে ওদের উত্তর জানতে চাইলেন -আপনি কোন ধরনের প্যারেন্ট? তিনি শুনলেন, আমি আধুনিক প্যারেন্ট, ,সমঝদার ও সহযোগী।
তাদের কণ্ঠে ছিল গর্ববোধ এবং শিশুদের আত্মমর্যাদায় তাদের ছিল আগ্রহ।
কিন্তু তার মনমতো হলো না।
দেখা গেল, দুনিয়ার অধিকাংশ মায়েরা প্রাথমিক ভাবে হয় শিশুদের বিনয় আনুগত্য অথবা তাদের আত্ম-মর্যাদার ওপর গুরুত্ব দিতেন। হয় প্রথমটি নতুবা দ্বিতীয়টি।
যেসব মায়েদের আগ্রহ শিশুদের ভাল ব্যবহারের প্রতি তাদেরকে বলা হতো কঠোর। আবার শিশুদের আত্ম-মর্যাদাবোধের উপর যাদের আগ্রহ ছিল বেশী তাদেরকে বলা হতো, লিবারেল প্যারেন্ট।
ইয়াং ওম্যান ভাবলেন এই দুই ধরনের পদ্ধতি-কঠোর ও লিবারেল দুটোই আংশিকভাবে ইফেকটিভ। তিনি জানলেন এই দুই ধরনের প্যারেন্টরা তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তারা তাদের করণীয় সম্পর্কে যা জানেন তার সবই করছেন। কিন্তু তিনি ভাবলেন, এটা ইফেকটিভ মায়ের অর্ধেক।
তিনি আশেপাশের শহরের অন্য মায়েদের সাথেও কথা বলা চালিয়ে গেলেন। কিন্তু যা চাওয়ার তা পেলেন না। ক্লান্ত ও হতাশ হয়ে তার এই খোঁজাখোঁজি শেষে প্রতিদিন বাড়ী ফেরেন।

ইয়াং ওম্যান অনেক আগেই এই খোঁজাখোঁজি ছেড়ে দিতে পারতেন কিন্তু ছাড়েন নাই একটি কারণে। তিনি জানতেন-তিনি আসলে কি খুঁজছেন। তিনি পরে তার স্বামীকে বলেছিলেন-একজন প্রকৃত ইফেকটিভ মা যে কোন ভাবে হউক জেনে নেন-কিভাবে দুনিয়ার সবচেয়ে ভাল পুরস্কার পেতে হয়।
তিনি জানেন-কিভাবে শিশুদেরকে নিজেদের ভালবাসতে শেখানো যায় এবং নিজেদের সাথে কি করতে হবে তা শেখানো যায়। এবং সম্ভবত সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ যে জিনিসটা তিনি জানেন তা হল-এই প্রক্রিয়া থেকে কিভাবে তা সবচেয়ে বেশী উপভোগ করা যায়।
অন্যদের সাথে কথা বলে যাওয়ার এই প্রক্রিয়ায় তিনি একজন একটিভ ও ইন্টারেস্টিং মহিলার সম্পর্কে চমৎকার কিছু বিষয় জানতে পারলেন। বৃদ্ধ বয়সেও মহিলা নিজের জীবনটাকে উপভোগ করে যাচ্ছেন। তিনি প্রত্যেকটি প্রয়োজনীয় কাজের জন্য পর্যাপ্ত সময় পেয়ে থাকেন। যে কথাটা ইয়াং মহিলার কানে আলোড়ন তুললো তা হলো বয়স্ক মহিলাটি একজন স্পেশাল মা-তার অবিশ্বাস্য সরল ও ইফেকটিভ একটি পদ্ধতি রয়েছে যা দিয়ে শিশুদের বড় করা যায়।
শোনা গেল বিশেষ এই মা অল্প প্রচেষ্টায় তিনজন সন্তানকে খুব সুন্দরভাবে বড় করতে পেরেছেন। প্রতিটি সন্তানকে ভাল ব্যবহারের ইয়াং স্টার মনে হয় এবং ভাল সমন্বয়কারী, সম্পদশালী ও সুখী এডাল্ট হিসাবে ওরা বড় হয়ে উঠেছেন।

বয়স্ক মহিলার তিনজন বড় হয়ে উঠা সন্তানের প্রত্যেকেরই সন্তান রয়েছে। তারাও একই প্যারেন্টিং সিস্টেম ব্যবহার করে সমান পরিমাণ সাফল্য পাচ্ছেন।
ইয়াং ওম্যান অবাক হয়ে ভাবলেন এসব কি সত্যি। যদি তাই হয় তবে ঐ মা কি তার গোপন কৌশল শেয়ার করবেন।
টেলিফোন বই থেকে উনার নাম্বার খুঁজে পেয়ে তিনি ফোন করলেন। শুনেছি, আপনি খুব ভাল প্যারেন্টিং সিস্টেম ব্যবহার করেন, ইয়াং মহিলা বললেন, “আমি কি আপনার ওখানে এসে কথা বলতে পারবো?”
“অবশ্যই”, মা উত্তরে বললেন, “আমার খুব ভাল লাগছে শুনে : যে কোন সময়ে তোমার সাথে দেখা হলে আমার ভালোই লাগবে”।
ইয়াং ওম্যান যখন সেই মায়ের বাড়ীতে এলেন তার মনে হয়েছিলো-অভ্যর্থনা জানাতে আসবেন একজন গ্রান্ডমাদার। কিন্তু তাকে অভ্যর্থনা জানালেন একজন প্রাণোচ্ছল, আকর্ষণীয়া মহিলা যাকে তার চেয়েও কম বয়সী মনে হলো। হবু মা আশ্চর্য্য হয়ে ভাবলেন, “তার প্যারেন্টিং পদ্ধতির জন্য এমন কিছু হলো কিনা? বেশ আরামের সাথে এক কাপ চা শেষ করার পর স্পেশাল মা জানতে চাইলেন, “এখন কিভাবে তোমাকে সাহায্য করা যায়?”
ইয়াং ওম্যান ইতস্তত করলেন। তারপর বললেন, “আমি জানি যে আপনি আপনার সন্তানদের লালন পালন করে এক বিরাট কাজ করতে পেরেছেন এবং আপনি তা করেছেন এক বিশেষ প্যারেন্টিং পদ্ধতির মাধ্যমে”।মৃদু হাসি দিয়ে মাদার জবাব দিলেন, “আমি আমার সন্তানদের নিয়ে খুবই গর্বিত। প্রত্যেকেই সুখী ও সামর্থবান এডাল্ট হিসাবে বড় হয়ে উঠেছে”।
ইয়াং ওম্যান সহজ হয়ে উঠতে শুরু করলেন, নোটবুক খুললেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, “মনে কিছু নিবেন না। আমি কিছু নোট নিতে চাই”।
মাদার হেসে বললেন, “মোটেই না-যতক্ষণ পর্যন্ত তোমার মনে না হয়-আমার কাছে সব প্রশ্নের উত্তর নেই এবং আমি একজন পারফেক্ট মা ছিলাম না”।
“আমি মাত্র কয়েকটি সিক্রেট শিখে নিয়েছিলাম”, মাদার পরামর্শের মত করে বললেন, “কিন্তু ওগুলো আমাদের জীবনে বাস্তবিকই এক বড় উন্নতি ঘটিয়েছে”।
ভিজিটর উৎসুক হয়ে উঠলেন সেগুলো জানার জন্য “আমার মনে হয় ডিসিপ্লিন দিয়ে শুরু করতে পারি”, তিনি বললেন, “অনেক প্যারেন্টস আমাকে বলেছে এটা বেশ কঠিন। আপনি কিভাবে আপনার সন্তানদের ডিসিপ্লিন শেখাতে পারলেন”।
“আমি তা করি নাই”-মাদার উত্তরে বললেন।
হতভম্ব ভিজিটর বললেন, “কি?”
মাদার মৃদু হাসলেন এবং বললেন, “বাস্তবিকই আমি আমার সন্তানদের ডিসিপ্লিন শেখাইনি। আমি তাদের নিজেদের মধ্যে ডিসিপ্লিন মানার জন্য কিছুটা সাহায্য করেছি।এটাই হল পথ”।মাদার মাথা নেড়ে যোগ করলেন, “এটা খুব কম পরিশ্রমের”।
“ওহ, তাহলে আপনি একজন লিবারেল টাইপের মাদার”,ইয়াং ওম্যান মতামত দিলেন।
“না। তা সত্যি নয়”-মাদার বললেন, “আমি এটুকু বিশ্বাস করি, গুড প্যারেন্টিং কষ্টসাধ্য হওয়া উচিত না। আমার ভয় হয় পারমিসিভ প্যারেন্টিং সন্তানদের উশৃঙ্খল করে ফেলতে পারে। এবং এরকম সন্তান যে কোন মাবাবার জীবনকে শেষ করে দিতে পারে”।
বেশ জানাশোনা মানুষের মত করে ইয়াং ভিজিটর বললেন-“তাহলে আপনি ভাল ব্যবহারের ব্যাপারে বেশ সচেতন। তার মানে আপনি যতটুকু সন্তানদের আত্মমর্যাদা কেন্দ্রিক (নিজেদের মধ্যে আত্ম-মর্যাদাবোধ বাড়ানো) তার চেয়ে বেশী আচরণকেন্দ্রিক (শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনে বিশ্বাসী)”।
মাদার সামনে ঝুঁকে বসলেন এবং শান্তভাবে বললেন, “আমি প্রায়ই এরকম কথা শুনে থাকি। এটা অনেকটা- কে আগে এসেছে মুরগী না ডিম? এরকম কিছু-শিশুদের ভাল ব্যবহার না শিশুদের ভাল সেলফ-ইমেজ?
“এক সময় আমাদের কাছে প্যারেন্টিং বেশ জটিল মনে হত”, মাদার বললেন, “কিন্তু তা আসলে বেশ সহজ হতে পারে”।
মাদার উঠে দাঁড়ালেন, নিজের ডেক্সের দিকে হেঁটে গেলেন। কিছু একটা হাতে নিয়ে ফিরলেন, “এটাই। এদিকে তাকাও”। তিনি ভিজিটরের হাতে একটি ফলক তুলে দিলে বললেন।
আমার সন্তানরা যখন ছোট ছিল। আমি এটাকে কাছে রাখতাম যাতে প্যারেন্টিং এর বেসিক সত্যটা যাতে সবসময় মনে থাকে।

শিশুরা যারা
নিজেদের পছন্দ করে
তারা নিজেদের সাথে
ভাল ব্যবহার পছন্দ করে

“যখন তুমি এই সহজ সত্যটা জানবে”, মাদার বললেন, “তোমার সন্তানদের সাথে কাজ করা সহজ হয়ে উঠবে”
ভিজিটর বললেন, -এটা কি সত্যিই ইম্পর্টেন্ট?
মাদার মৃদু হেসে বললেন, “আমি যে উপায়ে প্যারেন্টিং করে থাকি এটা তার সবচেয়ে মৌলিক আইডিয়া। কোন পরিবার শান্তিতে থাকবে আর কোন পরিবার চাপের মধ্যে এটাই বাস্তবে এই পার্থক্যটা সৃষ্টি করে”।
তখন মাদার ইয়াং ওম্যানকে সুযোগ করে দিলেন যাতে সে নিজেই উত্তরটা খুঁজে পায়। “সত্য জানার সবচেয়ে উত্তম পন্থা হলো নিজেকে প্রশ্ন করা। আমার নিজের অভিজ্ঞতার সাথে এর মিল আছে কি?”
“তোমার নিজের শৈশবকে নিয়ে ভাবো”-মাদার মুদৃভাবে তাকে উৎসাহ দিলেন, “তারপর নিজেকে প্রশ্ন করো- কখন আমি সবচেয়ে ভাল আচরণ করি? কখন নিজের সম্পর্কে ভাল অনুভব করি? অথবা কখন তা করি না?
ইয়াং ওম্যান মাথা নাড়লেন। মনে হলো তিনি নিজেকে দেখতে শুরু করেছেন “আমি বুঝে নিয়েছি”।
তিনি বললেন, “এখন আমি এটা নিয়ে ভাবছি, আমি সবচেয়ে ভাল ভাবে কাজ করি তখন, যখন নিজের সম্পর্কে ভাল অনুভূতি হয়”।
-অবশ্যই-বিস্মিত হওয়া মাদার উৎফুল্ল হয়ে বললেন, -আমরা সবাই তা করি”।
ইয়াং ওম্যান চেয়ার ছেড়ে উঠলেন, ফলকটা ডেস্কে নিয়ে রাখলেন। সেখানে দাঁড়িয়ে মিনিটখানেক গভীর ভাবে চিন্তা করলেন।
তাহলে তিনি বললেন, “নিজেদের সম্পর্কে ভাল অনুভব করতে সাহায্য করাই হচ্ছে শিশুদের কাছ থেকে ভাল ব্যবহার পাওয়ার চাবিকাঠি। আপনি কি এটাই বলছিলেন”।
“ইয়েস- মাদার উত্তরে বললেন, “ভাল সংবাদ হলো-যখন আপনি শিশুদেরকে নিজেদের সম্পর্কে ভাল অনুভব করতে সাহায্য করবে, তারা আরো ভালভাবে সব কিছু করে আপনাকে সাহায্য করবে”।
ইয়াং ওম্যানের আগ্রহ বেড়েই চললো। “আপনি এরি মধ্যে বলেছেন যে আপনি কোনো পারমিসিভ মা নন। তাহলে কিভাবে”-তিনি মাদারকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি নিজেকে বর্ণনা করবেন”।
“এটা খুব সহজ”, মৃদু হেসে তিনি বললেন, “আমি এক ওয়ান মিনিট মাদার”।

TG Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *