- Women Achievement

উড়ে যায় কালো ক্যাপ

জেসমিন চৌধুরী :: বহু প্রতীক্ষিত দিনটি এসে গেল। ভোরের মাতাল বাতাসে উড়ে যাচ্ছে আমার শাড়ির আঁচল, ইলার মাথার ক্যাপ। আমরা খুশি চেপে রাখতে পারছি না, বারবার হাসিতে ভেঙ্গে পড়ছি। গ্র্যাজুয়েশন হলের সামনে দু’হাজারেরও উপরে ছাত্র অভিভাবকের ভীড়, দরজা খোলার অপেক্ষা শুধু।

মায়ের সাথে ইলা

ইলা বলল, ‘মা থ্যাংক ইউ আমার জন্য এতো কিছু করার জন্য। আমরা খুব লাকি, সবাই এরকম সুযোগ পায় না’।
আমি বললাম, ‘আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ আমাকে এখানে এসে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেয়ার জন্য।’

আমার গলা ভেঙ্গে এলো, চোখে পানি। আশেপাশের হাজারো মানুষের উপস্থিতি উপেক্ষা করে মা মেয়ে জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে কাঁদলাম কিছুক্ষণ।

ইলা বলল, ‘এমন দিনে একটু না কাঁদলে কি হয়?’ আমি হেসে ফেললাম, চোখে তখনো পানি।

গ্র্যাজুয়েশন তো করে অনেকেই, কিন্তু এ তো যে কেউ নয়। এ হচ্ছে আমার ইলামনি, আমার ইলটু সোনা। যে মেয়ে সকালের নাশতা খেতে গিয়ে চামচ মুখে পুরে পৃথিবী ভুলে গিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত, স্কুলে ব্যাগ রেখে বাসায় চলে এসে ভয়ে ভয়ে বলত ‘মা আমার ব্যাগ কই?’, যার খাতায় অক্ষরগুলো বারবার উল্টো পাল্টা হয়ে গিয়ে শিক্ষকদের বিরক্ত করে তুলত, যাকে পারিবারিক অশান্তির অনেক ধকল পোহাতে হয়েছে ছোটবেলা থেকে, সেই মেয়ে আজ নিজের পরিশ্রমে ফার্স্টক্লাস অনার্সসহ গ্র্যাজুয়েট করেছে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

এতো আনন্দ আমি ধরে রাখতে পারি না, অশ্রু হয়ে একটু পরপর গড়িয়ে পড়তে থাকে। আবার চোখ মুছে হেসে দু’জনে সেলফি তুলি। মেক আপ লেপ্টে যেতে থাকে, সেই সাথে আমাদের নানান রকমের আবেগ।

‘মর্নিং শোউজ দ্য ডে’ কথাটা মিথ্যা নয়। আমি যখন দেশে ও’লেভেল ইংরেজি পড়াতে শুরু করেছিলাম, ইলার বয়স তখন আট/নয়। সে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে আমার পড়ানো মন দিয়ে শুনত, ছাত্রদেরকে আমার দেয়া টপিকের উপর সে ও আপন মনে রচনা লিখত যেগুলো অনেক সময় আমার ‘ও’ লেভেলের ছাত্রদের তুলনায় মন্দ হতো না। বিলেতে আবার পাড়ি দেবার পর দু’দেশের সংস্কৃতির ভিন্নতা, নতুন দেশে বারবার বাসা বদল, শহর বদল, জীবনের নানা চড়াই উৎরাই এর মধ্যে সে নিজের দায়িত্বের প্রতি সচেতন থেকেছে, পদে পদে আমাকে গর্বিত করেছে।

আজ একজন মানুষের কথা খুব মনে পড়ছে। ইলার অমনোযোগিতা নিয়ে শিক্ষকদের অভিযোগে আমি কিছুটা বিষণ্ণ হয়ে পড়লে ইলার স্কুলের একাডেমিক প্রধান Shameem Choudhury, যিনি প্রাথমিক পর্যায়ে তার ইংরজির শিক্ষকও ছিলেন, বলতেন ‘এগুলো একদম পাত্তা দিও না। ইলাকে একদম প্রেশার দেবে না, জ্বালাবে না। আমি তোমাকে বলছি এই মেয়ে জীবনে অনেক বড় হবে। তুমি দেখো’।

বাবা-মায়ের সাথে ইলা

এরকম অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন একজন শিক্ষক সবার জীবনে আসা খুব জরুরী। আজ একটি ছাত্র তার বক্তব্যে বলছিল মালাইলার একটি উক্তির কথা, ‘একটি কলম, একটি খাতা, একজন শিক্ষক আর একজন ছাত্র মিলে পৃথিবী পাল্টে দিতে পারে।’

প্রিয় শামীম মিস, আমি জানি না আপনি এই লেখাটি পড়বেন কী না, কিন্তু শুধু আপনাকে নয় পরিচিত/অপরিচিত সবাইকে আমাদের জীবনে আপনার অবদানের কথা জানাতে চাই আমি। সেই দুঃসময়ে যখন অনেক কিছুই ঠিক ছিল না, আপনার আশাবাদী কথাগুলো আমাদেরকে সাহস দিয়েছিল, আমাদের পৃথিবী বদলে দিতে অনেকখানি ভূমিকা রেখেছিল। আমার মেয়ের আজকের সাফল্যের কৃতিত্ব যতটুকু আমার ততটুকু আপনারও।

আমি অনেক নারীকে চিনি যারা মনে করেন স্বামীকে ছেড়ে গিয়ে সন্তান মানুষ করা সম্ভব নয়। আপনাদেরকে বলছি- একজন আত্মপ্রত্যয়ী মা একাই সন্তানের জন্য অনেক কিছু করতে পারে। বরং যে মা সাহসের সাথে নিজের আত্মসম্মান রক্ষার জন্য রুখে দাঁড়ায়, সে একটু বেশিই করতে পারে। সন্তানের জন্য প্রয়োজন একটা সুরক্ষিত নিশ্চয়তাপূর্ণ পরিবেশ। অনেক সময় দু’জন মিলেও এই পরিবেশ সৃষ্টি করা যায় না, আবার অনেক সময় একাই তা করা সম্ভব।

গ্র্যাজুয়েশন হলে ঢোকার সময় মেয়েটা যখন অবলীলায় তার ছাতা, ব্যাগ, ওভারকোট, খাতাপত্র সবকিছু আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিল আমি হেসে বললাম ‘আশা করি তোমার জন্য আমার ভার বওয়ার এখানেই সমাপ্তি হবে’।
মেয়েও হেসে বলল, ‘এখন থেকে আমি তোমার ভার বইব’।

অনেক লড়েছি, এবার আমার ছুটি। এই আনন্দটুকু সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চাই। সকল যুদ্ধরত সিঙ্গল প্যারেন্টদের প্রতি শুভেচ্ছা এবং ভালবাসা।

১৭ জুলাই ২০১৭

TG Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *