- Awareness

আমার বোনের রক্ত লাল

জেসমিন চৌধুরী :: আমার দেখা মৃত্যুগুলোর মধ্যে আমার বাবা-মা’র মৃত্যু সবচেয়ে কষ্টের হলেও সবচেয়ে মর্মান্তিক নয়। জীবনের প্রথম যে মৃত্যুটা আমাকে ভয়ঙ্কর ভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল সেটা ছিল আমার স্কুলবন্ধু শাহনাজের।

তখন আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি। শাহনাজ ক্লাস এইটে পড়লেও কোনো এক কারণে আমাদের মধ্যে খুব ভাল বন্ধুত্ব হয়েছিল। শাহনাজের মত মিষ্টি স্বভাবের মেয়ে আমি জীবনে খুব কম দেখেছি। কখনো কোনো নেতিবাচক কথা বলত না, সারাক্ষণ মুচকি মুচকি হাসত।

আমাদের স্কুল বিল্ডিং এর দোতলার অর্ধেকটাই ছিল রেলিংবিহীন খোলা ছাদ। ছাদের এক কোণায় দুপুর গড়ালে আমলকি গাছের মিষ্টি ছায়া পড়ত। আমি আর শাহনাজ সেই ছায়ায় পা ঝুলিয়ে বসে একসাথে টিফিন খেতাম। আমার টিফিন মানেই ছিল সোয়াবিন তেলে লাল আটা আর চিনি গুলে বানানো নিম্নমানের হালুয়া, সাথের রুটিও ছিল লাল আটার। হালুয়া আমি নিজে বানিয়েছি শুনে মুগ্ধ হতো শাহনাজ। আমার বাবা আর্মির রিটায়ার্ড কর্নেল আর তার বাবা ছিলেন আর্মির বর্তমান মেজর। সে প্রতিদিন বাবুর্চির হাতের সুন্দর করে বানানো রুটি ভাজি, মাঝে মধ্যে ডিম নিয়ে আসতো। আমরা পরস্পরের টিফিনে মহানন্দে ভাগ বসাতাম।

আমাদের স্কুলটা ছিল একটা ছোটখাটো টিলার উপর। সিলেট তামাবিল সড়কের পাশ ঘেঁষে সমান্তরাল চলে যাওয়া একটা সরু খাল। খালের ওপারে প্রাইমারি স্কুল, তারপর খানিকটা ধানি জমি, তার পেছনেই একটা মাঝারি উচ্চতার টিলার উপর আমাদের মনোরম পরিবেশের মাধ্যমিক স্কুলটি।

শাহনাজ প্রতিদিন ক্যান্টনমেন্টের বাসে করে স্কুলে আসত। জলপাই রঙ্গের বিশাল বাসটা ছাত্রদের রাস্তার পাশে নামিয়ে দিয়ে এম সি কলেজের উদ্দেশ্যে শহরের দিকে চলে যেত। ছাত্ররা ব্যস্ত তামাবিল সড়ক পার হয়ে খালের উপরের ছোট সাঁকোটি পেরিয়ে মেঠো পথটা ধরে স্কুলের টিলার উপর গিয়ে উঠত।

সেদিন স্কুলের কাছাকাছি যেতেই দূর থেকে জলপাই রঙ্গের বাসটাকে দেখে প্রাণপনে ছুটলাম আমি। একটু পরেই বাসটা আমাকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত বেগে চলে গেল। দূর থেকে দেখলাম রাস্তার অন্য পাশে শাহনাজ অন্যদের সাথে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে । আমি চিৎকার করে তার নাম ধরে ডাকলাম, হাত নাড়লাম। শাহনাজও হাত নাড়ল। আমি বন্ধুকে দেখে আনন্দে ছুটছি। এমন সময় দ্রুত বেগে আমাকে পাশ কাটিয়ে গেল আরেকটি যাত্রীবাহী বাস। এক মুহুর্তের জন্য বাসটি শাহনাজকে আমার দৃষ্টিসীমা থেকে আড়াল করে ফেলেছিল।

হঠাৎ কী থেকে কী হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না। শাহনাজকে কোথাও দেখতে পাচ্ছি না। মুহুর্তের মধ্যে কোথায় মিলিয়ে গেল মেয়েটি? সাঁকোর কাছাকাছি পৌছেঁ দেখলাম রাস্তার পাশে ছোটখাটো একটা ভীড়, চারদিকে চিৎকার চেঁচামেচি। ভীড় ঠেলে এগিয়ে গিয়ে দেখি খালের পাড়ে পড়ে আছে শাহনাজের রক্তাক্ত দেহ। তার আকাশী নীল রঙ্গের কামিজ আর সাদা পায়জামার অনেকটাই এখন টকটকে লাল। হতচকিত হলেও আমি ছুটে যেতে চাইলাম তার কাছে। কে একজন আমাকে জোর করে ধরে রাখল। তারপর কীভাবে কী ঘটল আমার ঠিক মনে নেই।

আমরা সবাই ক্লাসে বসে আছি। কেউ পাথর হয়ে আছে, কেউ হাউমাউ করে কাঁদছে। স্যার ক্লাসে এলেন, কেউ উঠে দাঁড়ালো না। স্যার জানালেন তামাবিল থেকে সিলেট শহরগামী যাত্রীবাহী একটি বাস রাস্তা পার হবার সময় শাহনাজকে বাড়ি মেরে চলে যায়। তার রক্তাক্ত নিথর দেহটি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে কিন্তু বেঁচে থাকার আশা খুবই কম।

একথা শুনে আমি প্রথমে ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না কী করব। এটা কীভাবে হতে পারে? ঘটনার কয়েক সেকেন্ড আগেই আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিল ও, হাত নাড়ছিল, আর এখন সে মৃত? আমি এতোক্ষণ কাঁদিনি, এইবার মেঝেতে গড়িয়ে কাঁদতে লাগলাম। কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না। কাঁদছিল ক্লাসের সব ছেলেমেয়েরা।

কিছুক্ষণ পর প্রধান শিক্ষক ক্লাসে এসে জানালেন যারা শাহনাজের সাথে খুব ঘনিষ্ঠ ছিল তাদের জন্য হাসপাতালে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন তিনি। নিজের শিক্ষকদের সম্পর্কে আমার অভিমত খুব একটা ভাল ছিল না। কিন্তু সেদিন প্রধান শিক্ষকের প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করেছিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাসে করে শাহনাজের ক্লাসের সব ছাত্রছাত্রীদের এবং আমাদের আরো কয়েকজনকে নিয়ে প্রধান শিক্ষক সহ কয়েকজন শিক্ষক হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। আমার জীবনে এর চেয়ে করুণ যাত্রা বোধ হয় আর আসেনি। পুরোটা রাস্তা আমরা শাহনাজের জন্য প্রার্থনা করতে করতে গেলাম।

ইমারজেন্সি বিভাগের কাছে বাস থামলে আমাদেরকে বাইরে অপেক্ষা করতে বলে শিক্ষকরা ভেতরে গেলেন। কিছুক্ষণ পর যখন তারা বেরিয়ে এলেন তখন তাদের মাথা ঝুঁকে আছে, মাটির দিকে দৃষ্টি। তারা আমাদেরকে কিছুই বললেন না। বাস আবার উলটো পথে যাত্রা করল। আমরা যা বুঝার বুঝে নিলাম।

এবার আর কেউ প্রার্থনা করছে না। অনেকেই চুপচাপ, কেউ কেউ ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না শাহনাজকে আর কখনোই দেখবো না। জলপাই গাছের ছায়ায় বসে তার সাথে রুটি ভাজি হালুয়া খাওয়া হবে না আর কখনো। ফেরার পর স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হল। বিক্ষিপ্ত, বিভ্রান্ত, ব্যথিত মন নিয়ে আমরা সবাই বাড়ি ফিরলাম।

দুইদিন পর আমাদেরকে অবাক করে দিয়ে শাহনাজের বাবা স্কুলে এলেন। আমাদের সবাইকে ক্যান্টনমেন্টে তার বাসায় যাওয়ার দাওয়াত দিয়ে গেলেন। শিক্ষকদের সহযোগিতায় স্কুলের অনেক ছেলেমেয়েরা মিলে দুইদিন পর বিকেল বেলা শাহনাজদের বাসায় গেলাম। নানান রকম মুখরোচক খাবারের আয়োজন করা হয়েছে আমাদের জন্য। আমরা চুপচাপ বসে খাচ্ছি। শাহনাজের মা-বাবা বারবার এসে জিজ্ঞেস করছেন আমরা ঠিক আছি কী’ না, কারো কিছু লাগবে কী না।

এর মধ্যে হঠাৎ ফোঁপানোর শব্দ শোনা গেল। অনেকেই খাবার প্লেট হাতে নিয়ে বসে কাঁদছে।, মুখে খাবার তুলতে পারছে না। এক কামরা থেকে অন্য কামরায় হেঁটে হেঁটে শাহনাজের শোকাহত মা-বাবা আর বড়ভাই সবাইকে শান্তনা দিচ্ছেন। ‘মানুষ চিরদিন বেঁচে থাকে না। তোমরা ওর জন্য দোয়া করো।’

আমি তখন অনেক ছোট। শাহনাজের পরিবারের আচরণ খুব অস্বাভাবিক মনে হয়েছিল আমার কাছে। এরা কাঁদছে না কেন? শাহনাজকে হারিয়ে কি এদের কষ্ট হচ্ছে না? এরা কি মেয়েটাকে ভালবাসত না? কেন আজ আমাদেরকে খাওয়ানোর এই আয়োজন? এগুলো কি খুব বেমানান নয়?

এতোদিন পর আজ যখন পুরো ঘটনাটার কথা ভাবি, শাহনাজের পরিবারের কথা বিশেষ করে তার মাবাবার কথা ভেবে শ্রদ্ধায় আমার মাথা নত হয়ে আসে। আমিও একজন মা। স্কুল থেকে ইউনিফর্ম পরিহিত সন্তানের মৃতদেহ ফেরত আসার কষ্টের কথা আমি ঠিক ধারণাও করতে পারি না। অথচ সেই অকল্পনীয় কষ্টের সময়টাতেও তারা আমাদের কথাই বেশি ভেবেছিলেন। আমাদের কচি মনে সেই ট্রমাটিক অভিজ্ঞতা কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন বলেই নিজেদের জীবনের সবচেয়ে শোকের সময়টাতে একঝাঁক বাচ্চাকাচ্চাকে বাসায় ডেকে আদর করে নাশতা খাইয়েছিলেন। বাংলাদেশে এমন নজির আর আছে কী না সন্দেহ।

মাঝখানের অনেকগুলো বছর আমি শাহনাজের মৃত্যুর কথা ভুলেছিলাম। আমার খুব আদরের রাসেল নামের একটি ছেলে ঐ একই সড়কে ট্রাকচাপা পড়ে মারা যাওয়ার পর নতুন করে শাহনাজের মৃত্যুর কথা মনে পড়ে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। কী করে ভুলেছিলাম? একই সড়কে মাত্র কয়েক শত গজের এবং কয়েকটি বছরের ব্যবধানে কীভাবে প্রিয় দু’জন মানুষকে সড়ক দুর্ঘটনায় হারানো যায়? কীভাবে সম্ভব?

(আজ এমন একটা সময়ে ফেসবুক ঘটনাটার কথা মনে করিয়ে দিল। আমরা শুধু কেঁদেছিলাম, প্রতিবাদ ও যে করা যায় জানতাম না। এখন সময় বদলেছে। আমি এখন এক মধ্যবয়েসী নারী কিন্তু শৈশবের ট্রমা আমার এখনো কাটেনি। এজন্যই হয়ত বাংলাদেশে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে আমার ভাবনা অনেকক্ষেত্রে শিশুসুলভ অর্বাচীনতায় দুষ্ট হয়েছে।)

 

১. একটি উজ্জ্বল সাফল্য

২. উড়ে যায় কালো ক্যাপ

TG Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *